প্রিন্ট এর তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ৪:২৫ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অগাস্ট ২১, ২০২৬, ৫:২৯ পি.এম
লক্ষ্যচ্যুত দেশের প্রথম স্টোন মিউজিয়াম: সরকারি টাকা অপচয়ে মাদকের আড্ডাখানা

কে.এম লিমন:
সিলেটের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংয়ে বিপুল পরিমান সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত দেশের প্রথম ‘জাফলং স্টোন মিউজিয়াম’ (পাথর জাদুঘর) এখন চরম অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে দেশের প্রথম এই ভূতাত্ত্বিক বা পাথর জাদুঘরটি তৈরি করা হয়েছিল, তার কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। উল্টো দেখভালের জন্য কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারী নিয়োগ না দেওয়ায় দৃষ্টিনন্দন এই সরকারি স্থাপনাটি এখন মাদকসেবীদের নিরাপদ আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে। সরকারি টাকার এমন অপচয় এবং দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জাফলংয়ের উন্মুক্ত শিলাস্তর, চুনাপাথর ও প্রাগৈতিহাসিক ভূ-তাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং গবেষণার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (বিএমডি) এবং স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এই জাদুঘর নির্মাণের রূপরেখা তৈরি হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১৯ থেকে ২১ ডিসেম্বরের মধ্যে জাফলংয়ে অনুষ্ঠিত পর্যটন মেলা ও পিয়াইন কাপ'র অংশ হিসেবে এই স্টোন মিউজিয়ামটির প্রাথমিক প্রস্তুতি কাজ সম্পন্ন ও আনুষ্ঠানিকভাবে এর দ্বার উন্মোচন করা হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উদ্বোধনের পর কিছুদিন পর্যন্ত এর কার্যক্রম সচল থাকলেও বর্তমানে জাদুঘরটির চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় এর চারপাশ ঝোপঝাড়ে ছেয়ে গেছে। ভবনের দরজা ও জানালার কাচ যেমন ভাঙা, তেমনই ভেতরে জমেছে ধুলোবালির আস্তরণ। পুরো এলাকায় কোনো নৈশপ্রহরী বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় সন্ধ্যার পর থেকেই সেখানে শুরু হয় মাদকসেবী ও বখাটেদের আনাগোনা। ফলে সাধারণ পর্যটকরা তো দূরের কথা, স্থানীয় মানুষও এই এলাকা দিয়ে যাতায়াত করতে ভয় পান।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, অত্যন্ত চমৎকার একটি উদ্দেশ্যে এই পাথর জাদুঘরটি নির্মাণ করা হয়েছিল যা আমাদের এলাকার জন্য গৌরবের। কিন্তু দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাবে এবং উদ্বোধনের পর কোনো লোকবল নিয়োগ না করায় এটি এখন একটি ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। বিপুল পরিমাণ সরকারি টাকা খরচ করে এভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।
জাফলং বিজিবি ক্যাম্প পর্যটন কেন্দ্র ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও পূর্ব জাফলং ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান 'জাফলং নিউজ ২৪.কম'কে বলেন, সরকার কোটি টাকা খরচ করে পর্যটকদের জন্য এত সুন্দর একটি মিউজিয়াম (জাদুঘর) তৈরি করল, কিন্তু দুঃখের বিষয়—এটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো পাহারাদার বা ঝাড়ুদার রাখা হয়নি। যত্নের অভাবে এখন এটি যেন একটি পরিত্যক্ত ভূতের বাড়ি! দিনে এটি পড়ে থাকে অবহেলায়, আর রাতে এখানে বসে মাদকের আসর। এই অনিয়ম ও অসামাজিক কার্যকলাপ আমাদের ঐতিহ্যবাহী জাফলং এলাকার পর্যটন শিল্পের সুনাম পুরোপুরি নষ্ট করছে। আমি প্রশাসনের কাছে অবিলম্বে এখানে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার জোর দাবি জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে নির্দিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রয়োজনীয় কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে জাদুঘরটি সচল করার এবং এর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় সরকারের এই মহতী উদ্যোগটি পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের অপচয় আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে গোয়াইনঘাটের ইউএনও রতন কুমার অধিকারী 'জাফলং নিউজ ২৪.কম'কে বলেন, মিউজিয়ামটি প্রস্তুত করে চালু করা হলেও এখনো স্থায়ী জনবল কাঠামো বা কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি। আমরা সাময়িকভাবে এটি দেখাশোনা করার চেষ্টা করছি। তবে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে অবগত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
Copyright © 2026 All rights reserved Jaflongnews24.com