কে.এম লিমন:
সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম স্থবিরতা ও বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। উপজেলার মোট ১৩৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৫টিতেই কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। মাত্র ৫১টি বিদ্যালয়ে নিয়মিত প্রধান শিক্ষক থাকলেও, বাকি ৮৫টি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম চলছে ভারপ্রাপ্ত এবং চলতি দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের দিয়ে। এর মধ্যে ৫৭টি বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এবং ২৮টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকেরা প্রধান শিক্ষক হিসেবে চলতি দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী প্রধান শিক্ষকের এই তীব্র সংকটের কারণে একদিকে যেমন ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক পাঠদান, অন্যদিকে ভেঙে পড়েছে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনিক তদারকি।
স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকদের মতে, একটি বিদ্যালয়ের প্রাণ হলেন প্রধান শিক্ষক। তাঁর অনুপস্থিতিতে বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত ও চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান শিক্ষকেরা দাপ্তরিক কাজ, শিক্ষা অফিসের মাসিক সমন্বয় সভা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজেই সপ্তাহের সিংহভাগ সময় ব্যয় করছেন। ফলে তাঁরা শ্রেণীকক্ষে নিয়মিত পাঠদান করতে পারছেন না। একদিকে প্রধান শিক্ষকের শূন্যতা, অন্যদিকে সহকারী শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ সৃষ্টি হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে এই সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।
গোয়াইনঘাট উপজেলায় শিক্ষার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের মাঝে শতভাগ বই বিতরণ, উপবৃত্তি প্রদান এবং সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের নেওয়া নানা ইতিবাচক উদ্যোগের কারণে ঝরে পড়ার হার অনেকটাই কমেছে। কিন্তু এই অমিত সম্ভাবনা ভেস্তে যেতে বসেছে শুধুমাত্র যোগ্য ও স্থায়ী নেতৃত্বের অভাবে।
অভিভাবকেরা জানান, যদি এখনই প্রধান শিক্ষক সংকট সমাধান না করা যায়, তবে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না এবং উপজেলার পিছিয়ে পড়া শিশুরা আরও পিছিয়ে পড়বে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন (ভারপ্রাপ্ত) প্রধান শিক্ষক জানান, আমাদের একই সাথে ক্লাসের পড়ালেখার দায়িত্ব এবং স্কুলের যাবতীয় প্রশাসনিক কাগজপত্রের কাজ সামলাতে হয়। প্রায়ই বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে উপজেলা শিক্ষা অফিসে দৌড়াতে হয়। এতে আমরা না পারছি ক্লাসে মনোযোগ দিতে, না পারছি স্কুলের তদারকি সঠিকভাবে করতে। আমরা দ্রুত স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানাচ্ছি।
বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতি সিলেট জেলা শাখার সভাপতি মোঃ সাদিকুর রহমান বলেন, চলতি দায়িত্ব বা ভারপ্রাপ্ত দিয়ে সাময়িকভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানো সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক পদোন্নতির ক্ষেত্রে যে জটিলতা তৈরি হয়ে আছে, তা দ্রুত নিরসন করা প্রয়োজন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে স্থায়ী রূপ দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
যোগাযোগ করা হলে গোয়াইনঘাট উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বশীর শরীফ বলেন, উপজেলার ১৩৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৫টিতেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকার বিষয়টি আমরা ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। শূন্যপদগুলোতে প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখতে সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে স্থায়ী নিয়োগ বা পদোন্নতির মাধ্যমে এই সংকট দূর হলে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। বর্তমানে আমরা সীমিত জনবল নিয়েই শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
উপজেলার হাজার হাজার কোমলমতি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এবং প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা গোয়াইনঘাটবাসীর।