
২০০৯ সালের ঘটনা এখনো গোয়াইনঘাট উপজেলাবাসীর ভোটারদের কাছে উজ্জ্বল। তখন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী ছিলেন আব্দুল হাকিম চৌধুরী। ভোটের মাঠে নানা প্রতিবন্ধকতা। প্রশাসন, সরকার সব উল্টো। যেন উল্টো স্রোতে সাঁতার কাটা। কোনো কিছুই অনুকূলে নয়। আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচন। এই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া আব্দুল হাকিম চৌধুরী ভোটের মাঠে চমক দেখালেন। তখন তাঁর সাথে উপজেলা চেয়ারম্যান পদেপ্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে গোয়াইনঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ ইব্রাহিম,উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও অবিভক্ত আলীরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের একাধিক বারের চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া হেলাল, সহসভাপতি ও পূর্ব জাফলং ইউনিয়ন পরিষদের একাধিকবারের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফুর রহমান লেবু ও যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ ফারুক আহমদ। রাস্ট্র ক্ষমতায় তাকা ওই তিনজন হেভিওয়েট প্রার্থী ভোটের মাঠে আব্দুল হাকিম চৌধুরীর নিকট বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন। ভোটের মাঠ থেকে আব্দুল হাকিম চৌধুরীকে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা হলো। একে তো প্রশাসন। তার ওপর সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রাধান্য। দুপুরের পর ভোটকেন্দ্রের ভেতরেই ঢোকা যাচ্ছে না। প্রার্থী আব্দুল হাকিম চৌধুরীর সঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যেসব নেতারা ছিলেন তারাও পড়লেন প্রশাসনের রোষানলে। অনুসন্ধানে জানা যায়, গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপিকে এগিয়ে নিতে শুরুর দিকে যে ক’জন নেতা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তাদের মধ্যে আব্দুল হাকিম চৌধুরী ছিলেন অন্যতম। ২০১৪ সালের গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাচন আব্দুল হাকিম চৌধুরীর জন্য আরো বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়ে। কারণ ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি। বিনা ভোটে আওয়ামী লীগ রাস্ট্র ক্ষমতায় চলে যায় এবং সাথে সাথে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের আয়োজন করে। এ নির্বাচনে গোয়াইনঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগ একক প্রার্থী ঘোষণা করাহয় । অবিভক্ত পূর্ব জাফলং ইউনিয়ন পরিষদের একাধিকবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও সিলেট জেলা মুক্তি যোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফুর রহমান লেবুকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঘোষণা করায় এ নির্বাচন হাকিম চৌধুরীর জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। অপর দিকে দেশের বিভিন্ন উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অনেকেই জয়লাভ করেন। আব্দুল হাকিম চৌধুরী তখন স্রোতের বিপরীতে অবস্থান করে গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের অক্লান্ত পরিশ্রমে শেষ হাসি তিনিই হাসেন। পরবর্তী দুটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশে আব্দুল হাকিম চৌধুরী প্রার্থী হননি। গোয়াইনঘাট উপজেলায় জনশ্রুতি রয়েছে ওই দুটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আব্দুল হাকিম চৌধুরী প্রার্থী হলে মোট ৪ বার গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতেন। সিলেট -৪ আসন (গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও জৈন্তাপুর উপজেলায়) ভোটে ‘ফ্যাক্টর’ আব্দুল হাকিম চৌধুরী। দলগতভাবে তার অবস্থান বেশ শক্তিশালী। তিনিই এখন গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও জৈন্তাপুর উপজেলা বিএনপি’র বড় অংশের অভিভাবক। বিগত তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপিসহ উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন বিএনপি তার হাত ধরেই সাজানো হয়েছে। বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল সহ সব অঙ্গ-সংগঠনও শক্তিশালী হয়েছে। আওয়ামী লীগ জমানায় আন্দোলন সংগ্রামের সময় তিনি নেতাদের সামলিয়ে রেখেছেন। সিলেট-৪ আসনের মাদার উপজেলা গোয়াইনঘাটে আগে থেকেই শক্তিশালী অবস্থান আব্দুল হাকিম চৌধুরীর। এ আসনের ৩ টি উপজেলার ভোটারের অর্ধেক গোয়াইনঘাট উপজেলায় রয়েছে বিএনপি’র ভোট ব্যাংক। কয়েক দশক ধরে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের দলীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে জনগণের কাছাকাছি ছিলেন আব্দুল হাকিম চৌধুরী। এরপর যখন তিনি ভোটের মাঠে নামেন তখন তাকে আর পিছু তাকাতে হয়নি। বিশেষ করে তিন উপজেলার প্রবীণ ব্যক্তিরা তাকে সাদরে গ্রহণ করে নেন। সাধারণ মানুষও তাকে বরণ করেন সহজেই। গোয়াইনঘাট উপজেলার নন্দিরগাওঁ ইউনিয়নের নওয়াগাওঁ গ্রামে আব্দুল হাকিম চৌধুরীর বাড়ি। তিনি ছিলেন নন্দিরগাওঁ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যানও। তাই তিন উপজেলার গ্রাম-পাড়ার অলিগলি তার চেনা। তার দাদা আব্দুল মতিন চৌধুরীও চেয়ারম্যান ছিলেন গোয়াইনঘাট উপজেলার নন্দিরগাওঁ ইউনিয়নের।
সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পরিবার হওয়ার কারণে তাদের রয়েছে আলাদা আধিপত্য। ফলে তিন উপজেলাবাসীর কাছে তিনি কাছের জন হিসেবে পরিচিত। এ কারণে ২০০৯ ও ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটে চমক দেখিয়েছিলেন আব্দুল হাকিম চৌধুরী। তিন দশকের বেশি সময় ধরে ভোটের মাঠে থাকার কারণে এ আসনের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছাকাছি গেছেন তিনি। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগণ, সংখ্যালঘু ভোটারে তার রয়েছে আলাদা আধিপত্য। এবারের দুর্গাপূজায় আগে থেকেই মাঠে নেমেছেন তিনি। ইতিমধ্যে তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও মতবিনিময়ে নেমেছেন। বিশেষ করে সামাজিকভাবে পূজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি কাজ করছেন। এতে ভরসাও পাচ্ছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এ আসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আব্দুল হাকিম চৌধুরী নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তার নির্দেশে গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও জৈন্তাপুর উপজেলায় বিএনপি’র নেতারা সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আব্দুল হাকিম চৌধুরী নিজে গিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে মতবিনিময় করে আস্থা ফিরিয়ে আনেন। গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও জৈন্তাপুর উপজেলার বিএনপি’র নেতারা জানিয়েছেন- আব্দুল হাকিম চৌধুরী প্রাকৃতিক সম্পদের গর্ভধারিণী সিলেটের সীমান্তবর্তী জনপদ, পর্যটনের সম্ভাবনায় সিলেট-৪ আসনের গ্রহণযোগ্য প্রার্থী। বিএনপি’র মনোনয়ন পেলে আগামী নির্বাচনে আব্দুল হাকিম চৌধুরীই পড়বেন বিজয়ের মালা- এ নিয়ে আশাবাদী তারা।
















