
কে.এম লিমন:
সিলেটের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র জাফলংয়ের শত শত বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যের স্মারক ‘শ্রী শ্রী কালীবাড়ী মন্দির’ (স্থানীয়ভাবে রাজবাড়ী মন্দির নামেও পরিচিত) এবং ঐতিহাসিক ‘জুমপাড়’ এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। চারপাশ থেকে অবাধ, অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে পাথর ও বালু উত্তোলনের ফলে ঐতিহাসিক এই উপাসনালয়টি বর্তমানে একটি বিচ্ছিন্ন টিলায় রূপ নিয়ে কার্যত ‘দ্বীপে’ পরিণত হয়েছে। আশপাশের বিশাল অংশজুড়ে গভীর গর্ত তৈরি হওয়ায় এবং পিয়াইন নদীর তীব্র ভাঙনে মন্দিরে যাতায়াতের সব ধরনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা, আসন্ন বর্ষা মৌসুমে যেকোনো সময় এই প্রাচীন মন্দির ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি ধসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ৩নং পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের ছৈলাখেল ৩য় খন্ডের (বল্লাপুঞ্জী সংলগ্ন) ১ নং খতিয়ানের ২৭ নং দাগের ১৬ শতক জায়গার ওপর এই ঐতিহাসিক মন্দিরটি অবস্থিত। পাথর টিল্লা মামার বাজার এলাকার নন্দমহনের ছেলে কুঞ্জবিহারী সেবাইতের মাধ্যমে স্থানীয় সনাতনী হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যবহারের জন্য এই যায়গাটি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও অন্যতম প্রধান এই উপাসনালয়টি জাফলংয়ে ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছেও একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিত।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, অনুমানিক ১৩০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে এই অঞ্চলে খাসিয়া ‘মালনিয়াং’ রাজবংশের শাসন ছিল। মেঘালয় সীমান্ত সংলগ্ন পান-সুপারি বাগান ঘেরা এই জুমে নিয়াং ও মাইলং রাজাদের আমলের রাজপ্রাসাদ ও উপাসনালয়ের প্রাচীন পাথরের দেয়াল, ফটক ও প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ এখনও কালের সাক্ষী হয়ে আছে। স্থানটি স্থানীয়ভাবে “জাফলং রাজবাড়ী” বা “খাসিয়া রাজবাড়ী” নামে পরিচিত হলেও, এটি মূলত জৈন্তিয়া বা খাসিয়া রাজাদের আমলে নির্মিত একটি ঐতিহাসিক শ্রী শ্রী কালীবাড়ি মন্দির। এর চারপাশের বিশাল পাথরের প্রাচীর ও ফটকের কারণে অনেকে একে ভুলবশত রাজবাড়ী মনে করেন। মূলত এটি ৭০০ বছরের পুরনো এক সভ্যতার শেষ চিহ্ন।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বেশ কয়েক বছর ধরে বল্লাঘাট এলাকার জুম পাহাড়ের পাদদেশে রাতের আঁধারে এক শ্রেণির অসাধু চক্র অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন করে আসছে। এর ফলে পুরো এলাকাটি এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মন্দিরের ঠিক পাদদেশ ঘেঁষে চারদিকের মাটি ও পাথর খুঁড়ে নিয়ে যাওয়ায় টিলাটি যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ওঠার বা যাওয়ার কোনো স্বাভাবিক সুযোগ নেই; দূর থেকে দেখলে মনে হয় এক টুকরো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নামমাত্র টিকে আছে। শুধু মন্দিরটিই নয়, এর ফলে আশপাশের বিপুল পরিমাণ বাগান, ফসলি জমি ও প্রাচীন সভ্যতার শেষ চিহ্নগুলো এখন তীব্র ভাঙনের মুখে পড়েছে। এই ঐতিহ্যবাহী পবিত্র স্থানটির এমন দূরবস্থায় স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী ও এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।

মামার বাজার পাথর টিল্লা কালী মন্দির পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি শ্রী অংশু গোসাই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাতের আঁধারে যন্ত্রদানব দিয়ে যেভাবে পাথর ও মাটি সরানো হয়েছে, তাতে আমাদের এই পবিত্র স্থানটির পায়ের তলার মাটি আর অবশিষ্ট নেই। প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও পাথরখেকো চক্র সুযোগ পেলেই আবার খনন শুরু করে। দ্রুত স্থায়ী বাঁধ বা প্রতিরক্ষা দেয়াল না দিলে আগামী বর্ষায় মন্দিরটি আর রক্ষা করা যাবে না।

ঐতিহাসিক এই স্থান ও এর চারপাশের ফসলি জমি রক্ষায় মাঠ পর্যায়ে তৎপরতা চালাচ্ছে স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, সিলেট বিভাগের মধ্যে প্রত্নসম্পদে সমৃদ্ধ গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলা। এই দুই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রাচীন জৈন্তারাজ্যের বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ইতিমধ্যে ধ্বংস হয়েছে। গোয়াইনঘাট উপজেলার পিয়াইন নদীর তীরে অবস্থিত মন্দিরের জুম নামে পরিচিত স্থাপনাটি ধ্বংসের শেষ সীমানায় এসে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ আইন অমান্য করে নির্বিচারে পাথর উত্তোলনের ফলে এখানে সর্বনাশ করা হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন স্থাপনাটি রক্ষায় কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখেনি। আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই—অবিলম্বে পাথর উত্তোলন বন্ধ করে স্থাপনাটির অবশিষ্ট অংশ রক্ষা করা হোক এবং এই সম্পদ ধ্বংসের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, জাফলংয়ের জুমপাড় এলাকার অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন বন্ধে আমাদের নিয়মিত টাস্কফোর্স ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলমান রয়েছে। ঐতিহাসিক মন্দিরটি রক্ষায় আমরা অত্যন্ত আন্তরিক। ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও আশেপাশের ফসলি জমি রক্ষায় জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং মন্দিরটি সুরক্ষায় দ্রুতই একটি স্থায়ী ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

ইতিহাস, ঐতিহ্য আর ধর্মীয় অনুভূতির প্রতীক এই প্রাচীন কালী মন্দির ও ৭০০ বছরের পুরনো সভ্যতার প্রাচীন নিদর্শনটি রক্ষায় আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন সুশীল সমাজসহ সর্বস্তরের জনগণ।












