
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষতিকর অনলাইন জুয়া। স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের সহজলভ্যতাকে পুঁজি করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে এই মরণব্যাধি। ফলে একদিকে যেমন নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো পরিবার, অন্যদিকে ধ্বংসের মুখে পড়ছে স্থানীয় তরুণ ও যুবসমাজ। দ্রুত এই সামাজিক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এলাকায় অপরাধ প্রবণতা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গোয়াইনঘাটের বিভিন্ন ইউনিয়ন, হাট-বাজার এবং গ্রামাঞ্চলে ওয়ান-এক্সবেট (1xBet), মেলবেট (Melbet), বাজি লাইভ (Baji Live) এবং বিভিন্ন অনলাইন ক্যাসিনো অ্যাপের মাধ্যমে এই জুয়া খেলা চলছে। বিভিন্ন লোভনীয় বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, বেকার যুবক, এমনকি শ্রমজীবী মানুষও এতে জড়িয়ে পড়ছেন। মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, রকেট, নগদ) সেবার সহজলভ্যতার কারণে খুব সহজেই টাকা লেনদেন করা যাচ্ছে, যা এই জুয়া ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
অনলাইন জুয়ার পেছনে টাকা ঢালতে গিয়ে অনেক তরুণ পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। শুরুর দিকে সামান্য লাভের মুখ দেখলেও, পরবর্তীতে বিশাল অঙ্কের টাকা হেরে ঋণের সাগরে ডুবছে তারা। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক যুবক পরিবারের জমানো টাকা চুরি, জমি বন্ধক রাখা, এমনকি গবাদিপশু বিক্রি করে দিচ্ছে। অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের এমন আচরণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে এবং সমাজে মুখ দেখাতে পারছে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গোয়াইনঘাটের বিভিন্ন বাজার ও মোড়ে সন্ধ্যার পর স্মার্টফোন হাতে তরুণদের সন্দেহজনক আড্ডা বাড়ছে। জুয়ায় হেরে গিয়ে টাকার জন্য তারা এলাকায় ছোটখাটো চুরি, ছিনতাই এবং মাদক কারবারের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক জানান, আমার ছেলে আগে নিয়মিত পড়াশোনা করত। এখন সারাদিন মোবাইলে কী যেন খেলে আর টাকা চায়। টাকা না দিলে ঘরে ভাঙচুর করে। আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় আছি।
বিদ্যমান আইন অনুযায়ী যেকোনো ধরণের জুয়া অপরাধ এবং শাস্তিমূলক অপরাধ হলেও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহারের কারণে এদের সহজে ধরা যাচ্ছে না। দেশের সাইবার নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী অনলাইন জুয়া বা এর প্রচারণায় জড়িত থাকলে কঠোর সাজা ও জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতার অভাব এবং জোরালো অভিযানের অভাবে গোয়াইনঘাটে এটি বন্ধ করা যাচ্ছে না।
স্থানীয় শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, কেবল পুলিশি অভিযান দিয়ে এই মরণনেশা বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা। মা-বাবাকে খেয়াল রাখতে হবে তাদের সন্তান মোবাইলে কী করছে এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের পেছনে কত সময় ও অর্থ ব্যয় করছে। একই সাথে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত বাজারগুলোতে নজরদারি এবং সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন তারা।
গোয়াইনঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, অনলাইন জুয়াড়ি এবং এর স্থানীয় এজেন্টদের বিরুদ্ধে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ইতিমধ্যেই আমরা গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করেছি। বেশ কয়েকজন এজেন্টকে গ্রেপ্তার করে নিয়মিত মামলার মাধ্যমে আদালতের নির্দেশনায় জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। তবে শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে এই সামাজিক ব্যাধি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রতিটি পরিবার এবং সমাজের সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে, সন্তানরা মোবাইলে কী করছে—সে বিষয়ে অভিভাবকদের কঠোর নজরদারি রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।











