
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর ও সহিংস অপরাধের ঘটনায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে পুলিশের উপস্থিতিতে হত্যাকাণ্ড, থানার মূল ফটকের সামনে প্রকাশ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং সর্বশেষ পুলিশের গাড়িতে ডাকাত দলের হামলার ঘটনায় উপজেলার সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে তীব্র মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
সুত্রে জানা যায়, গত শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে উপজেলার পূর্ব আলীরগাঁও ইউনিয়নে এক নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিজের মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ এনে থানায় লিখিত অভিযোগ করায় কলিম উল্লাহ (৫৫) নামের এক ব্যক্তিকে তাঁরই আপন বড় ভাই ও ভাতিজা মিলে কুপিয়ে হত্যা করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গোয়াইনঘাট থানার এসআই নাঈমুল হাসানসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্যের উপস্থিতিতেই এই হামলা ও খুনের ঘটনা ঘটে।
যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে চলে যাওয়ার ১০ মিনিট পর এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। ঘটনার পর পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালিয়ে ঘাতক পরিবারের সদস্য জুবের আহমদকে আটক করলেও প্রধান অভিযুক্তরা এখনো পলাতক রয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই গত রবিবার (১৬ আগস্ট) দুপুরে গোয়াইনঘাট থানার ঠিক মূল ফটকের সামনে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, পানের ভ্যানের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সামান্য ধাক্কা লাগাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের লোকজনের মধ্যে প্রথমে কথা-কাটাকাটি ও পরে লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মারামারি শুরু হয়। থানার সামনে এমন ভয়াবহ মারামারির ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এই সংঘর্ষে উপজেলার লেঙ্গুরা গ্রামের শামীম ও আরব আলী এবং পিরিজপুর গ্রামের আনিসুর রহমান নামের ৩ জন গুরুতর আহত হন। ঘটনার পরপরই পুলিশ অ্যাকশনে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং চাকুসহ তারেক নামে এক যুবককে ঘটনাস্থল থেকে আটক করে।
সর্বশেষ রবিবার দিবাগত রাত (১৭ আগস্ট) উপজেলার সতি গ্রামে একদল সশস্ত্র ডাকাত কর্তৃক পুলিশের টহল গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। জানা যায়, রাতে নিয়মিত টহলের অংশ হিসেবে পুলিশ সদস্যরা ওই এলাকায় টহল করছিলেন। এ সময় একদল সংঘবদ্ধ ডাকাত দল অতর্কিতভাবে পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালায়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে খবর পেয়ে অপর পুলিশ সদস্যদের একটি ব্যাকআপ টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে ডাকাত দল পিছু হটে এবং অন্ধকারে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এই ঘটনায় কোনো পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত না হলেও পুলিশের ওপর এমন দুঃসাহসিক হামলায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
উপজেলায় পরপর ঘটে যাওয়া এসব ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, যেখানে থানার সামনে বা পুলিশের উপস্থিতিতেই অপরাধীরা এত উগ্র রূপ ধারণ করতে পারে, সেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানান, থানার সামনে মারামারি কিংবা পুলিশের গাড়িতে হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে অপরাধীরা এখন আর আইনকে তোয়াক্কা করছে না। দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হবে।
সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনগণের উদ্বেগের বিষয়ে জানতে চাইলে গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওমর ফারুক মোড়ল জানান, প্রতিটি ঘটনার পরই পুলিশ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়েছে। লাফনাউট গ্রামের হত্যাকাণ্ডের পর আসামিদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। থানার সামনে সংঘর্ষের ঘটনাটি ছিল একটি আকস্মিক দুর্ঘটনা, সেখানেও পুলিশ তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে এবং জড়িত একজনকে আটক করেছে।
ওসি আরও বলেন, সতি গ্রামে পুলিশের গাড়িতে ডাকাত দলের হামলার চেষ্টার পর পুরো উপজেলাজুড়ে নিরাপত্তা ও পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে। অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। গোয়াইনঘাটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ প্রশাসন বদ্ধপরিকর, আমরা সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানাচ্ছি।












